রবিবার, মে ১৬, ২০২১

ইহাও একটি ভালোবাসার গল্প – শেখ মোহাম্মদ আশরাফুল | বাংলা টাইমস ২৪

প্রতিকী ছবি
ইহাও একটি ভালোবাসার গল্প
শেখ মোহাম্মদ আশরাফুল

আজকেও অফিসে লেট হবে। গাড়ির জন্য দাড়িয়ে আছে আদনান। সা সা করে চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে ব্যাস্ত শহরের গাড়ি গুলো। আদনান  বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। আকিজ গ্রুপ অব কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা  তিনি। হাতের ঘড়িতে তখন সকাল সোয়া সাতটা বাজে। দৃষ্টিটা হাতের ঘড়ি থেকে সড়াতে না সড়াতেই ভাগ্য সু-প্রসন্য হল। গন্তব্য স্থানে পৌছে দেওয়ার মত একটা বাহন সামনে এসে দাড়াল। বরাবরের মত ট্রাফিক জ্যাম থাকলে আজকে নিশ্চিতভাবেই আদনান সাহেবের অফিসে লেট হত।

যাই হোক ৮.০০ টা বাজার মিনিট পাঁচেক আগেই অফিসে পৌছতে পেরে আদনান সাহেব লম্বা শ্বাস নিলেন।দশ তলা হাইলি ডেকোরেটেড অফিস। প্রতিটা আনাচে-কানাচে সব সধুনিকতার ছোয়া এই অফিস টাতে। বর্তমান সভ্যতার সকল সুবিধায় আছে এই অফিসে। লিফটে উঠেই ৫ নম্বর বোতাম চাপল আদনান। একটা লম্বা শাস নেওয়ার আগেই লিফট পোউছে দিল পঞ্চম তলায়। লিফট থেক নেমে নিজের পরিচিত রুমটাতে প্রবেশ করল আদনান। চেয়ারে বসতেই টেবিলে প্রথম আলো পত্রিকার দিকে চোখ পড়ল তার। অফিসে এসে সব সময় তিনি দুটি বিষয় অনুভব করেন। একটা হল গফুর ভাইয়ের উপস্থিতি, অন্যটা গফুর ভাইয়ের অনুপস্থিতি। 

টেবিলে আগে থেকেই এক কাপ হালকা চিনি দিয়ে তৈরী চা রেখে দেওয়া, পত্রিকাটি নিচের সিড়ি রুম থেকে আদনানের টেবিলের উপর রেখে যাওয়া, ওয়াক্ত মত খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া ইত্যাদি কাজ গুলো যেদিন সঠিক মত হয় সেদিন আদনান গফুর ভাইয়ের উপস্থিতি অনুভব করেন । চায়ের মাঝে চিনির পরিমানের ব্যাত্যয় ঘটা মানেই বুঝতে হবে আজ গফুর ভাই আসে নি। গফুর ভাইয়ের ব্যাপারে যদি দু-চার কথা লিখতে হয় ,তাহলে লিখতে হবে দায়িত্ববান,সততা ও সরলতার এক মূর্ত প্রতিক। পত্রিকাটি হাতে নিয়ে চোখ বুলাতে বুলাতে চায়ের কাপে চুমুক দিল আদনান। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই আদনান একটা গরমিল খুজে পেল। চায়ে চিনির পরিমান ঠিক নেই। তাহলে কি গফুর ভাই আজকে আসে নি?  আসে নি বললে ভুল বলা হবে। নিশ্চই গফুর ভাই অসুস্থ।তাই আসতে পারে নি। কিছুটা উদ্ধিগ্নতা নিয়ে রুম বেলে হাত চাপলেন আদনান। অফিস পিয়ন সিদ্দিক হাজির হলেন।

সিদ্দিকঃ জ্বি,স্যার ডেকেছেন?
আদনানঃ আচ্ছা গফুর ভাই আজকে আসেন নি কেন? তুমি তো গফুর ভাইয়ের সাথেই থাকো, গফুর ভাই কি অসুস্থ ?
প্রশ্নটা করতে না করতেই গফুর নিজে এসে হাজির হলেন। কি গফুর ভাই, তোমাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন? তুমি কি অসুস্থ?
গফুরঃ না স্যার,  আমার কিছু হয় নাই। আমার পোলাডা কয়েকদিন ধইরা জ্বর। হাতে যা টেকা আছিল শেষ কইরা ফেলাইছিলাম। তাই কাইলকা আমার আরেক ছাওয়ালরে কুরবানি দিয়া ওষুদের টেকা জোগাড় করলাম। আমার বুধুর জন্য মনডা খুব কানতাছে । বুধু আমার পোলার চেয়ে কোন  অংশে কম আছিল না। নিজের হাতে প্রতিদিন মাঠে চড়াইছি। খাওয়াইছি। গোসল করাইছি। একই ঘরে ঘুমাইছি। সেই বুধুরে আমি নিজের হাতে কসাইয়ের হাতে তুইল্যা দিছি। সামনের শুক্কুরবারেই বুধুরে জবাই দিয়া দিব।  বলেই আবার হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিল গফুর। বুধু গফুর মিয়ার পিতৃস্নেহে লালন করা পোষা খাসি। বুধ বারে জন্ম নিয়েছিল  তাই  আদর করে নাম টা বুধু রাখা হয়েছিল।

আদনানঃ আরে বোকা নাকি তুমি গফুর ভাই!!! কান্না থামাও। তোমার টাকা লাগবে আমাকে জানাবা না?? কার কাছে বিক্রি করছ? কত বিক্রি করছ? আমি টাকা দিচ্ছি ,তুমি এখন ই যাও।

এই কথা বলতে বলতেই দশ হাজার টাকা ড্রয়ার থেক বের করে গফুরের হাতে তুলে দিলেন আদনান। আর এক্ষনি বুধুকে ছাড়িয়ে আনতে বললেন।  সিদ্দিক পিয়ন গফুর মিয়া আর তার বস এর কাহিনি গুলো দেখতেছিলেন আর অবাক হচ্ছিলেন। একটা খাসির জন্য গফুর মিয়া সকাল থেকে কান্না করতেছে।এটা দেখে সে গফুর মিয়াকে যাচ্ছে তাই বকে গেল।খাসির জন্য কেউ কান্না করে না কি!!! এখন সে তার বসের কাহিনি দেখে আরো অবাক হয়ে গেল। যে বস দুই টাকার একটা নোট কখনো অনার্থক খরছ করে নি, সেই বস আজকে দশ হাজার টাকা দিয়ে দিল!!!!
ততক্ষনে হাসিখুসি মনে, চোখে মুখে অনেক কৃতজ্ঞতা নিয়ে গফুর বুধুকে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশে বিদায় নিল। সিদ্দিক পিয়ন ও নিজের কাজে চলে গেল। এখন আদনান রুমে একা। এতক্ষনে হঠাত করে তার চোখ দুটি ভিজে উঠল। কয়েক ফোটা অশ্রু ফ্লোরের উপর  টুপটপ শব্দে ঝড়ে পড়ল। পটুর কথা খুব মনে পড়ছে আদনানের।

২০০৩ সাল। ঈদুল আযহা কে তখন বকরি ঈদ বলে জানত সে। বকরি ঈদ বলা হত কারন সে সময় ঈদুল আযাহ তে বকরি (খাসি) কুরবানি দেওয়া হত। গরু কুরবানি দেওয়ার মত সাধ্য সে সময় খুব কম জনার ই ছিল। আদনান তখন ক্লাস নাইনে পড়া ১৪ বছরের টগবগে যুবক। পাশের গ্রামের একটা খ্রীস্টান মিশনারী হাই স্কুলে দরিদ্র তহবিলের আর্থিক সহযোগীতা নিয়ে পড়ত সে। নিত্যান্তই গরীব ঘরের সন্তান আদনান। আল্লাহ পাক তাকে শুধু দারিদ্রতা দেননি সাথে দিয়ে ছিলেন বিচক্ষন মেধাশক্তি। যা একবার পড়ত সাথেই মনে গেথে রাখতে পারত। সে ক্লাসে সবসময় প্রথম হত। গণিতে খুব ভাল দক্ষতা ছিল আদনানের। খ্রীস্টান মিশনারী হাই স্কুলের মেধা তালিকার প্রথম সাড়ির ছাত্রদের সে সময় খুব কদর ছিল সব জায়গায়। সে কারনে আদনানের গ্রামে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। সে যখন ক্লাস এইটে পড়ত তখন থেকেই সে টিউশনি করাত। গণিতে ভাল মেধা থাকার কারনে অনায়েসেই ক্লাস সিক্সের একজন ছাত্রী ও ক্লাস ফোরের একজন ছাত্রকে পড়াত সে।

মাস শেষে টিউশনি থেকে আয় হত ২০০ টাকা। পুরু টাকাটাই বাধ্য ছেলের মত মায়ের কাছেই জমা করত। সে কত স্বপ্নই না দেখত সেই টাকা নিয়ে। মাকে সামনের ঈদে কাপড় কিনে দিবে, বোন কে জুতা কিনে দিবে। মেলায় যাবে। বিশ টাকা দিয়ে পুরু একদিনের জন্য সাইকেল ভাড়া করে নিখিলের সামনে দিয়ে চালাবে। আর একটু পর পর বেল বাজাবে। যেমন টা বাজিয়ে নিখিল তার কান জ্বালাপালা করে দিয়েছিল অল্প কিছুদিন আগেই। এবারের ঈদে অনেকগুলা তারাবাতি কিনবে ,লজেন্স কিনবে আর একটা ইংলিস হালফ প্যান্ট কিনবে আর বাপ্পিদের বাসার সামনে গিয়ে তারাবাতি জ্বালিয়ে  আর লজেন্স মুখে নিয়ে আনন্দ করবে। বাপ্পিকে এমন আনন্দ করতে প্রতিবার ঈদেই দেখে আদনান। 

যাই হোক দেখতে দেখতে বছর ঘুরে ফাইনাল পরীক্ষা আসল।আদনান আবারো ক্লাসে প্রথম স্থান অর্জন করে দশম শ্রেণিতে উর্ত্তীণ হল। গত এক-দেড় বছরে টিউশনি করে যা আয় হল তা কিন্তু আর তিন অঙ্কের সংখ্যা নয়। আয়ের অংকটি চার অংকের সংখ্যায় পরিনত হয়েছে বেশ আগেই।

তখন বাংলায় মাঘ মাস। প্রচন্ড শীত। কিছুদিন পরই রোজা শুরু হবে। হঠাত একদিন স্কুল থেকে বাসায় এসে দেখে বাসায় একটা উদ্ভট প্রাণির উপস্থিতি টের পেল আদনান। বাসায় ডুকতেই মে মে ছাগলের ডাক শুনতে পারল সে। সাথে দুইটা বাচ্চা ছাগলের চিকন গলায় মে মে ডাক। সারা বাড়ি মাথায় তুলে রাখার মত অবস্থা। ছাগল আর ছাগলের বাচ্চার মে মে ডাকে আদনানের অনেক বিরক্ত লাগতে লাগল। প্রচন্ড রকম বিরক্তি নিয়েই মায়ের কাছে ছুটে গেল সে।

“মা, মা, ও মা, কই তুমি? বাসায় এই ছাগল আনল কে? মাথা তো নস্ট করে দিল” প্রতি উত্তরে যা শুনল তা শুনে আরো মেজাজ খারাপ হয়ে গেল আদনানের। ছাগল টি তার জমানো ৩৩০০ টাকা দিয়ে তার মা তার জন্য কিনে আনছে। তাকে আরো বলা হয়েছে যে এই ছাগলটি এখন থেকে তাকেই লালন পালন করতে হবে।

একসময় এই ছাগলের আয় থেকে সে অনেক ধনী হয়ে যাবে। আদনান রাগে মাথার চুল ছেড়ার উপক্রম। সে সারাদিনের জন্য সাইকেল ভাড়া করবে বলে কথা দিয়ে আসছে লিটন কে। আতসবাজী ফাটিয়ে এবার ঈদে বাপ্পিদের ঘুম নষ্ট করে দিবে একথা সবাইকে জানিয়ে রাখছে। মেলায় যাওয়া। বোনের জন্য জুতা কিনা। সব শেষ। ভাগ্যে জুটল কিনা বিরক্তিকর ছাগল।সাথে দুইটা বাচ্চা ছাগল বোনাস !!

মন খারাপ করে ঘরের কোনায় বসে ছিল আদনান। ঠিক তখন ই মায়ের ডাক পড়ল। মায়ের ডাকাডাকি আর ছাগলের ডাকাডাকি মিশে গিয়ে একটা বিশাদময় সুর তৈরী করছে। যেটা আদনানের মন আরো খারাপ করে দিচ্ছে। ঠিক এমন সময় মা পিছন থেকে এসে ধমক দিয়ে বললেন, এই আদনান কানে শুনিস না? কখন থেকে ডাকতেছি!!

“তোমার ডাক শুনব কিভাবে? ছাগলের ডাক শুনেই তো শেষ করতে পারছিনা!!! মা কিছুটা রাগ নিয়ে বললেন, “ছাগল ডাকবে না তো কি করবে? সকাল থেকে ছাগল টা উপোষ, যা ঘাস কেটে নিয়ে আয়”। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম “ছাগলের জন্য ঘাস কাটতে যাব আমি!!!!” আমার খেলা আছে বিকালে।আমি আজ পারবোনা”।

“আবারো মায়ের দমক,  কোন খেলা টেলা নাই। যা এক্ষুনি যা”।  আর কোন কথা না বারিয়ে কাচি হাতে রওনা দিল সে। ঘাস কাটল আর ছাগল টাকে মনে মনে বকা দিল। ছাগলটির দুটি বাচ্চা ছিল। একটা ছেলে আরেকটা মেয়ে। ছেলে বাচ্চাটি সাদাকালো মিশ্র রঙের। তবে সাদার চেয়ে কালো রঙ এর অংশই বেশি। গলার নিচে শুধু কিঞ্চিত অংশ সাদা। মেয়ে বাচ্চা ছাগলটি সম্পুর্ণ কালো। তবে একটু রোগা।

যাই হোক এভাবেই চলতেছিল । বন্ধুদের সাথে মজার মজার খেলাধুলা বাদ দিয়ে বিকেল বেলা ঘাস কাটত আদনান। কাটত বললে ভুল হবে। কাটতে হত। ভাবত কবে শেষ হবে আমার এই দুর্দিন।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখে ছাগলের ডকাডাকি একদম ই নাই। কিছুটা আশ্চর্য হল সে। পরে কাছে গিয়ে দেখে ছাগল টা খুব অসুস্থ। সাথে বাচ্চা মেয়ে ছাগলটা ও। কিছু খায়না। দাড়াতেও পারে না। শুধু মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। আর চোখ দিয়ে কান্নার মত করে পানি ঝড়ছে। যদিও পৃথীবির সব ছাগলকেই ঘৃনা করতে শুরু করেছিল সে, সাথে তার বাসার ছাগলের এই পুরা ফ্যামিলিকেও। কিন্তু ছাগল পরিবার টার এমন অবস্থা দেখে তার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। বাচ্চা দুটি দুধের জন্য কান্না করছিল। মা ছাগলটি খুব চেষ্টা করছিল উঠে দাড়ানোর জন্য।বাচ্চা গুলোকে একটু দুধ খাওয়ানোর জন্য মা ছাগলটির চেষ্টা দেখে তার মনটা আরো খারাপ হতে লাগল।  সাথে সাথেই মায়ের কাছে ছুটে গেল সে। মাকে জিজ্ঞাসা করল কি হয়েছে।

“তুই তো এটাই ই চাইছিলি, নে তর ইচ্ছা পূরুন অইল। আর ঘাস কাডোন লাগব না। যা খেলতে যা তুই”। প্রতিদিন সে একটু সুযোগ খুজত খেলতে যাওয়ার। আর মা তাকে খোলা সুযোগ দিল। তা ও তার পা চলছেনা মাঠের দিকে। খুব অবশ লাগছে পা দুটি। ছাগলের বাচ্চাটার মত। মাকে আবারো জিজ্ঞাসা করল ,” ও মা, বল না কি হইছে?” “বাতাস লাগছেরে বাপ,ঐ পুস্কুনির পাড় থেইক্যা বাতাস লাগছে” আদনান শুধু ভাবল এটা আবার কেমন বাতাস।কিছু ই বুঝল না। কানের মাঝে শুধু ছাগলের ডাকাডাকির শব্দ গুলো মিস করতেছিল। ঘৃনা করতে করতে যে কখন অনেক্টুকুন  ভালোবাসা জন্ম নিয়েছিল এই ছাগল ফ্যামিলির উপর বুঝতেই পারেনি।

পরদিন খুব ভোর বেলা মায়ের কান্নার শব্দে আমার ঘুম ভাঙ্গল। ঘুম ভাংতেই সে যা দেখল তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। মা ছাগল আর বাচ্চা মেয়ে ছাগল টা মারা গেছেন। পাশে ছেলে বাচ্চা ছাগল টা দাঁড়িয়ে কাঠাল পাতা চিবুচ্ছিল আর মাঝে মাঝে গুতো দিয়ে মাকে উঠার জন্য আহবান জানাচ্ছিল। মা খুব কাদল ঐ দিন। সে-ও কেদেছিল। তবে নিরবে। কয়েক ফোটা কান্নার জল তার গাল বেয়ে মাটি ছুয়ে ছিল সেদিন। সাড়া বিকেল একা একা বসে ছিল কাচি হাতে। আর বাচ্চা ছাগল টি আমার গা ঘেসে শুয়েছিল সাড়া বিকেল। যেন মা ও বোনকে হাড়িয়ে সে-ই তার একমাত্র পরিবারের সদস্য। সন্ধ্যা হওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে কয়েক গোছা ঘাস কেটে ছাগলছানা টিকে কোলে নিয়ে বাসায় ফিরল আদনান।তার কোলে বাচ্চা ছাগলটিকে দেখে মাও অবাক হয়েছিলেন কিছুটা।

পরদিন স্কুল থেকে ফিরার পথে বাচ্চা ছাগলটির একটা নাম ঠিক করল আদনান। পটু। হ্যা, পটু-ই তার  লালিত বাচ্চা ছাগলের নাম।

অনেক ক্ষন ধরেই তাকে বাচ্চা ছাগল বলা হচ্ছে। না, এটা আর ভালো লাগছেনা।  সে তার জীবনে সাধারণ কোন বাচ্চা ছাগল ছিলনা। সে ছিল তার ভালোবাসা। পটু ছিল তার প্রাণের সাথে মিশে থাকা একটি বন্ধুর নাম। সে দিনের পর থেকে আদনান কে আর কখনো কেউ খেলার মাঠে দেখে নি । স্কুল থেকে ফেরার পর পটুর সাথেই আনন্দের সাথেই প্রতিটা বিকালকে সন্ধ্যা বানাত আদনান। পটুর জন্য আর কখনোই ঘাস কাটেনি আদনান। বরং পটুকে নিয়ে চড়ে বেড়িয়েছিল মাঠের পর মাঠ। ভালোবাসায় আটকে পড়লে পশু-পাখিও যে ভালোবাসার একান্ত বাধ্যগত হয়ে যায় তার প্রমাণ কিন্তু পটু তার প্রতিটা কাজেই দিয়ে যাচ্ছিল। আদনানের সাথে মাঠে-ঘাটে ঘুড়ে বেড়াত। কখনো কারো ফসলে মুখ দিত না। আদনানের প্রতিটা কথাই যেন সে বুঝতে পাড়ত। প্রতিদিন সকাল বেলা মোরগ ডাকার সাথে সাথেই পটুর ভালোবাসার যন্ত্রনা শুরু হয়ে যেত। যতক্ষন না পর্যন্ত আদনান বিছানা ছেরে তার সাথে বাহিরে যেত ততক্ষন পর্যন্ত শিং দিয়ে গুতো দিতেই থাকত সে। বাধ্যহয়ে খুব সকালেই বিছানা ছেড়ে উঠত সে। শুধু ঘুম থেকে উঠিয়েই ক্ষ্যান্ত হতনা সে। উঠোনের সামনে খোলা জায়গায় তাকে নিয়ে লাফালাফি করতে হবে অল্প কিচ্ছুক্ষন। এই ধরে নিতে পারেন মর্নিং এক্সারসাইজ।

তারপর কিছুটা সময় আদনানকে বিশ্রাম দিত পটু। নারিকেল গাছটার গোড়ার দিকে তার আসন ব্যাবস্থা ছিল একটা। সেখানে বসে কাঠাল পাতা চিবুতো আর এমন ভাব নিয়ে তাকিয়ে থাকত যেনো পন্ডিত মশাই আড়াম করছেন। সেই ফাকে আদনান তার নাস্তা সহ সকালের কাজ-কর্ম সেরে নিত।

গন্ডগোলটা বাধত তখন ই যখন আদনান স্কুলের যাওয়ার জন্য সাদা রঙের শার্ট টা পরত। নেভী ব্লু কালারের প্যান্ট আর সাদা শার্ট ছিল আদনানের স্কুলের ইউনিফর্ম। নীল রঙ মনে হয় পটু চোখে দেখত না, তাই প্যান্ট পরতে দেখলে তার কোন সমস্যা হত না। কিন্তু সাদা শার্ট যখন ই পরতে দেখত তখন ই তার মাথায় গন্ডগোল পাকত। তাকে একা রেখে অনেক ক্ষনের জন্য আদনানের চলে যাওয়ার প্রস্তুুতিটা পটু ভালোভাবে নিতে পারত না। পটুর লাফালাফি।  চিল্ল্যাপাল্ল্যা। গুতু দিতে থাকা।এসব চলত বেশ কিছুক্ষন।

তারপর ব্যার্থ হয়ে চুপচাপ আবার নারিকেল গাছের সেই আসনে মন খারাপ করে বসে থাকা।সেই বিকাল হওয়ার আগ পর্যন্ত পটু কোথাও যেতনা। এমন কি ঘাস-পানি কিছুই খেতনা। আদনান ফিরতে ফিরতে প্রায় সময়-ই বিকাল ০৪.০০ টা বাজত। পটু যখন ই আদনান এর পায়ের শব্দ শুনত তখন ই দৌড়ে রাস্তার দিকে ছুটে যেত। যতক্ষন না পর্যন্ত তাকে কোলে তুলে না নিবে ততক্ষন পর্যন্ত লাফালাফি করতেই থাকত সে। তারপর আদনানের কোলে চড়ে বাসায় ঢুকত।

বিকাল বেলা আবারো বের হত তারা দুই বন্ধু। কথা বলত।গল্প করত। ঘুরে বেড়াত এক মাঠ থেকে আরেক মাঠে।এক ক্ষেত থেকে আরেক ক্ষেতে। লাফালাফি।ঝাপাঝাপি। একজনের ভাষা আরেকজন খুব বুঝত। ভালোবাসার একটি নিজস্ব  ভাষা আছে। যা কেবল ভালোবাসলেই বুঝা যায়। পটু আর সে ভালোবাসার ভাষায় কথা বলত। 

এভাবেই সুন্দরভাবেই কাটতেছিল দিন গুলো। দেখতে দেখতে আদনানের প্রি-টেস্ট শেষে টেস্ট পরিক্ষা ও শেষ হল। আদনান আবারো প্রথম হল। এস.এস.সি. পরিক্ষার আর মাত্র দুই থেকে তিন মাস বাকি। স্কুল থেকে বলে দিছে ফরম ফিলাপের ফি জমা দিতে। ফি এর টাকার অংকটা খুব একটা কম ছিল না। তিন মাসের কোচিং ফি, মডেল টেস্ট সহ চার হাজার সাত শত টাকা। বাসায় এসে মাকে জানাল আদনান। ক্লাসে আবারো প্রথম হয়েছে শুনে খুব খুসিই হয়েছিলেন তার মা।কিছু না বুঝে পটুও কয়েকবার লাফিয় উঠেছিল। কিন্তু মুহুর্তেই আবারো মুখটা বিষন্নতায় ফ্যাকাশে হয়ে গেল মায়ের। এত টাকা কোথায় পাবে উনি। কয়েকদিন আগেই বড় বোনটার জ্বর হয়েছিল।হাতে জমানো যা ছিল সব তো ঔষুধ কিনতেই খরচ হয়ে গেছে। এতটাকা কোথায় পাবে এখন । আগামী ২৪ তারিখের মাঝেই জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। অর্থাৎ, আর মাত্র ৬ দিন। যাইহোক, মুখে একটা ম্লান হাসি টেনে দিয়ে শান্তনা দিয়ে বলল “তুই ভাবিস না, আমি টাকার ব্যাবস্থা করে ফেলব” সে-ও আর চিন্তা করল না। সে জানে তার মা কিছু একটা ম্যানেজ করে ফেলবে।কিন্তু তার মা পারল না ম্যানেজ করতে। অনেকের কাছেই টাকা খুজল। কিন্তু পেল না।পরদিনই টাকা দেওয়ার শেষ দিন ছিল। আদনান স্কুলে যাওয়ার আগে এটা মাকে মনে করিয়ে দিয়ে গেল। যদিও সে জানত তার মা সবই জানে। সবই মনে আছে।

সেদিন স্কুল থেকে ফিরতে দেড়ি হল আদনানের। বাসায় আসতে আসতে সাড়ে পাচটা বেজে গেল।  এসে দেখে মায়ের হাতে অনেক গুলো টাকা। তার মানে মা টাকা জোগাড় করে ফেলেছে। কিছুটা স্বস্তি নিয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, “ মা টাকা কি জোগাড় হল?”। মা চুপ থাকল। কিছুই বলল না। কি যেন বারবার বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু বলছিল না। একটা সময় মা কেদে উঠলেন। আদনান কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। কি হয়েছে? মা কাদছে কেন?

পাশ থেকে বোন তাকে ডেকে নিল। আদনান আবারো জানতে চাইল কি হয়েছে। তার বোনটিও কেদে উঠল। কিছুই বুঝতে ছিল না সে ।
হঠাত করেই  পটুর কথা মনে করল। আচ্ছা, পটু কোথায়? মাকে জিজ্ঞাসা করল, বোনকে জিজ্ঞাসা করল। কেউ উত্তর দিলনা। আদনানের উতকন্ঠা আরো বাড়তে লাগল। কেন উত্তর দিচ্ছে না কেউ? পাশ দিয়েই হেটে যাচ্ছিল নোহাশ। নোহাশ তার আদরের ভাতিজা,এবার ক্লাস টু’তে পড়ে।

আদনানের পাশাপাশি পটুকে নোহাশ-ও খুব ভালোবাসত।  “চাচ্চু , চাচ্চু , জানো আমি তোমাকে খুজতেছিলাম, তুমি যখন স্কুলে গেলা, তারপর একটা দুষ্টু লোক এসে পটুকে টেনে টেনে, মেরে মেরে নিয়ে চলে গেছে। দাদু কিচ্ছু বলে নি, পটু অনেক কেদেছে, তোমাকে আমি খুজেছি অনেক। আমাদের পটুকে নিয়ে আস চাচ্চু”

আদনানের  অনুপস্থিতিতে কি কি ঘটেছে বুঝতে তার  বাকি রইল না। হাউমাউ করে কেদে উঠল সে। মাকে জড়িয়ে ধরে একটা প্রশ্নই করল,”কেন এমন করলে ,মা?’ উত্তরে মা জানাল যে অনেকের কাছে হাত পেতেও টাকা জোগাড় হয় নি, কোন উপায় না দেখেই এমন কাজটি করতে হল। সে দিন সাড়াদিন সেই নারিকেল গাছের গোড়ায় বসেছিল আদনান।  প্রতিদিন ই স্কুল থেকে ফিরে নারিকেল গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকত আদনান। তার শুধু মনে হত পটু হয়ত গাছের গোড়ায় ফিরে এসেছে। তার সাথে অভিমান করে বসে আছে। ঝড়-বৃষ্টি হলেই নারিকেল গাছের গোড়ার দিকে তাকিয়ে থাকত আদনান। যদি পটু ফিরে এসে তার সাথে অভিমান করে ভিজতে থাকে।

কিন্তু পটু আর কখনোই ফিরে আসে নি।
দেখতে দেখতেই এস.এস.সি. পরীক্ষা চলে আসল। আদনান পরীক্ষা দিল। আবারো অসাধারন কৃতিত্বের সাথে এস.এস.সি. পাশ করল সে। পুরো থানায় তার চেয়ে ভালো রেজাল্ট কেউ করে নি। যে দিন রেজাল্ট দিল সবাই খুব আনন্দ করল। শুধু একটানা সাড়াদিন কেদেই গেল আদনান। সে দিন ও সে অনেক কেদেছিল। আজকে পটুর জীবনের বিনিময়ে তার জীবন গড়তে চলল। সে ভালো কিছু হতে চলল। ভালোবাসা দিয়ে পটু জিতে গেল। আর হেরে গেল সে। পটুর তাকে হারিয়ে দিল।

আদনান কাদতেছিল। এখন পর্যন্ত অনেক ফোটা চোখের জল ফ্লোরে পরেছে। মায়ের একটা কথা সবসময় কানে বাজত,” এক সময় এই ছাগলের আয় থেকে সে অনেক ধনী হয়ে যাবে।“
আজ আদনানের অনেক টাকা। অনেক টাকা বেতন পায় সে। তবে সে এমনভাবে ধনী হতে চায় নি।
ততক্ষনে গফুর মিয়া তার বুধুকে নিয়ে চলে আসছে। অনুমতি না নিয়েই ধুম করেই রুমে প্রবেশ করে ফেলল গফুর। তার মনে খুব আনন্দ।  সাথে সাথেই কান্নাকে আড়াল করতে চাইল আদনান।

“ তা গফুর ভাই, তুমি তোমার বুধুকে পাইছ?” “ জ্বি, স্যার, পাইছি।আমার পোলাডায় অনেক খুসি, আমিও অনেক খুসি আইছি, আপনি অনেক ভালা মানুষ। আপনি খাসি এতো  ভালোবাসেন!!! গফুর শুধু এইটুকুই বুঝল যে আদনান খাসি অনেক ভালোবাসে। না ব্যাপারটা এমন ছিল না। আদনান ভালোবাসাকে অনেক ভালোবাসে।  ভালোবাসাকে বাচিয়ে রাখতে ভালোবাসে। একটা ভালোবাসাকে নিশ্চিত মরে যাওয়া থেকে বাচাতে পেরে তার অনেক ভালোলাগছে।

আদনানঃ আচ্ছা গফুর ভাই তোমার বুধুকে আমাকে দেখাবা না? গফুরঃ অবশ্যই স্যার। কবে দেখতে যাবেন বলেন।

আদনানঃ আজকেই যাব।চলো। এক্ষুনি যাব।
গফুরঃ সত্যি যাবেন স্যার????
আদনানঃ হ্যা চল। বুধুকে দেখতে আদনান আর গফুর রওনা হল গফুরের বাসার উদ্দেশ্যে । অল্প কিছুক্ষন পরেই তারা পৌছে গেল গফুরের বাসায়।

গফুরঃ স্যার, এই যে আমার বুধু। আরো মোটা তাজা ছিল। দুই দিনে শুকাইয়া গেছে। আদনান খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল বুধুর দিকে। আরে এত তার পটু। একদম পটুর মত দেখতে। গলার নিচে সাদা সাদা লোম গুলোও মিলে গেছে। বুধুর কাছে যেতেই বুধু আদনানকে গুতো দিতে লাগল। যেমনটা পটু করত। যেনো পটুকে ফিরে পেল আদনান। বুধুর গলায় জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেংগে পরল আদনান। বুধুও তার গলা আদনানের গাড়ের উপর রেখে চুপটি করে রইল।

গফুর কিছুই বুঝতেছিলনা। শুধু হা করে তাকিয়েই রইল। অনেকক্ষন পর আদনান অনেক খুসি মনে ফিরে আসল। গফুর আর বুধু তখন-ও কথা বলতেছিল।  ভালোবাসার  নিজস্ব  ভাষায়। ভালোবাসা বেচে রইল। ভালোবাসা বেচে থাকুক। ভালোবাসাকে মরে যেতে দিতে নেই, বাচিয়ে রাখতে হয়। যারা ভালোবাসাকে বাচিয়ে রাখতে পারে না। তারা অভাগা। পরিপুর্ণ অভাগা।

(সংক্ষেপিত)

লেখকঃ  শেখ মোহাম্মদ আশরাফুল
জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর,ফুড টেকনোলজি
মৌলভীবাজার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Latest news

কবে প্রকাশ হবে এইচএসসি’র ফল

চলতি ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে প্রকাশ হবার কথা ছিল ২০১৯-২০ এইচএসসি ও সমমানের ফলাফল। এরআগে চলমান মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বাতিল করা হয় এ বছরের...

সুইসাইড নোট লিখে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ গৃহবধূর

হবিগঞ্জের মাধবপুরে সুইসাইড নোট লিখে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন দুই সন্তানের জননী। শনিবার (২৬ ডিসেম্বর) দুপুরে উপজেলার আখাউড়া সিলেট রেলসেকশনের তেলিয়াপাড়া রেল...

নরসিংদীতে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু

নরসিংদীর পাঁচদোনায় শীলমান্দীতে নানার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নির্মাণাধীন একটি কারখানার বালু ভরাটের পানির গর্তে পড়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (২৬ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় সদর...

করোনায় আরও ১৯ জনের মৃত্যু

মহামারি করোনা ভাইরাসে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৭ হাজার ৩৭৮। এছাড়া গত...

Related news

কবে প্রকাশ হবে এইচএসসি’র ফল

চলতি ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে প্রকাশ হবার কথা ছিল ২০১৯-২০ এইচএসসি ও সমমানের ফলাফল। এরআগে চলমান মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বাতিল করা হয় এ বছরের...

সুইসাইড নোট লিখে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ গৃহবধূর

হবিগঞ্জের মাধবপুরে সুইসাইড নোট লিখে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন দুই সন্তানের জননী। শনিবার (২৬ ডিসেম্বর) দুপুরে উপজেলার আখাউড়া সিলেট রেলসেকশনের তেলিয়াপাড়া রেল...

নরসিংদীতে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু

নরসিংদীর পাঁচদোনায় শীলমান্দীতে নানার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নির্মাণাধীন একটি কারখানার বালু ভরাটের পানির গর্তে পড়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (২৬ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় সদর...

করোনায় আরও ১৯ জনের মৃত্যু

মহামারি করোনা ভাইরাসে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৭ হাজার ৩৭৮। এছাড়া গত...

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে